নাম কেবল মানুষের পারস্পরিক ডাক বা পরিচয়ের মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি জাতির সভ্যতা, বিশ্বাস এবং ঐতিহ্যের জীবন্ত দলিল। বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় মুসলিম সমাজে নামকরণের যে বৈচিত্র্য দেখা যায়, তা পৃথিবীর অন্য কোনো প্রান্তের মুসলিমদের মধ্যে খুব একটা দেখা যায় না। আমরা যারা বাংলাদেশ, ভারত বা পাকিস্তানের মানুষ, আমাদের নামের শুরুতে ‘মোহাম্মদ’ (সংক্ষেপে মোঃ) এবং শেষে ‘ইসলাম’, ‘মোল্লা’ বা ‘মুন্সি’ র মতো পদবি যুক্ত করা এক শাশ্বত নিয়মে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এই নামকরণের আড়ালে যে দীর্ঘ ইতিহাস এবং আধ্যাত্মিক দর্শনের দায়ভার লুকিয়ে আছে, তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।
নামকরণের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটঃ
উপমহাদেশের নামকরণের এই রীতির পেছনে প্রধানত ‘স্বাতন্ত্র্য রক্ষা’ র ইতিহাস কাজ করেছে। কয়েক শতাব্দী ধরে এই ভূখণ্ডে হিন্দু ও মুসলিমরা পাশাপাশি বসবাস করে আসছে। হিন্দু ধর্মে নামের শুরুতে ‘শ্রী’ বা ‘শ্রীমতী’ এবং শেষে ‘দাস’, ‘শীল’, ‘গোস্বামী’ বা ‘চক্রবর্তী’ র মতো পদবি ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের বংশ ও ধর্মীয় পরিচয় অত্যন্ত স্পষ্ট ছিল। মুসলিম সমাজ যখন এই মিশ্র সংস্কৃতির মাঝে নিজেদের স্বতন্ত্র ধর্মীয় অস্তিত্ব ও আভিজাত্য বজায় রাখতে সচেষ্ট হয়, তখনই তারা নামের দুই প্রান্তে ধর্মীয় রক্ষাকবচ হিসেবে কিছু শব্দ যুক্ত করতে শুরু করে।
বিশেষ করে ব্রিটিশ আমলে যখন আধুনিক নথিপত্র এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রবর্তন হয়, তখন নাম দেখে ধর্ম চেনাটা জরুরি হয়ে পড়ে। সজীব, রাজীব বা শান্তার মতো অনেক নাম আছে যেগুলো মূলত ভাষাগত, যা হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত। এই অস্পষ্টতা দূর করতে এবং নিজের ঈমানি পরিচয়কে নথিপত্র গেঁথে দিতেই নামের শুরুতে প্রিয় নবীর (সা.) প্রতি ভালোবাসা ও বরকতের প্রতীক হিসেবে ‘মোহাম্মদ’ যোগ করা শুরু হয়।
আল্লাহর ভালোবাসা ও রাসূলের (সা.) আদর্শঃ
মানুষ হিসেবে আমরা অত্যন্ত নগণ্য। স্রষ্টা এবং সৃষ্টির মধ্যকার দূরত্ব অসীম। আমরা কোথায়, আর মহাবিশ্বের অধিপতি আল্লাহ কোথায়! মাঝে মাঝে মনে হয়, আমার মতো সামান্য এক বান্দার পক্ষে সেই পরম সত্তার ভালোবাসা পাওয়া কি আদৌ সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর আল্লাহ নিজেই সহজ করে দিয়েছেন পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে। সূরা আল-ইমরানের ৩১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ এরশাদ করেছেন— (হে নবী) আপনি বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসতে চাও, তবে আমার অনুসরণ করো। তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন।
বিষয়টি একটি উপমার মাধ্যমে বোঝা যায়। আমি লন্ডনে বসবাসরত একজন সাধারণ মানুষ। আমার পক্ষে কি কোনো দেশের রাজপরিবারের অতি আপন হওয়া সম্ভব? উত্তর হলো— না। কিন্তু সেই রাজপরিবারের কোনো সদস্য যদি নিজ থেকে আমাকে পছন্দ করে এবং তার বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয়, তবে সেই অসম্ভব মুহূর্তেই সম্ভব হয়ে ওঠে। আল্লাহ তাআলাও তাঁর রাসূলকে (সা.) পৃথিবীতে পাঠিয়ে আমাদের প্রতি সেই ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। রাসূলের (সা.) প্রতিটি সুন্নাহ যদি আমরা অনুসরণ করি, তবে স্বয়ং আল্লাহ আমাদের বলবেন, “আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
একটি নির্মম প্রতারণা ও আত্মদহনঃ
কিন্তু এখানেই এক ভয়াবহ সত্য আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। কুরআনের আয়াত মতে আল্লাহর ভালোবাসা পেতে হলে রাসূলের (সা.) আদর্শ অনুযায়ী চলা বাধ্যতামূলক। অথচ আমরা আমাদের নামের শুরুতে রাসূলের নামের অংশটুকু লাগিয়ে তাঁর আদর্শের ছিটেফোঁটাও জীবনে ধারণ করছি না। এটি কি এক ধরনের নির্মম প্রতারণা নয়?
প্রিয় নবীর নামের পবিত্র অংশটি নামের শুরুতে জুড়ে দিয়ে আমরা যখন তাঁর সুন্নাহর বিপরীতে চলি— তিনি যেভাবে বসতে বলেছেন তার উল্টোটা করি, কিংবা তাঁর শেখানো আমানতদারিতার বদলে ধোঁকা বেছে নেই— তখন মনে হয়, আমি কি তবে এই নাম নিয়ে তামাশা করছি? নামের শুরুতে ‘মোহাম্মদ’ রাখা আর কাজকর্মে তাঁর অবাধ্য হওয়া কি চূড়ান্ত পর্যায়ের ভণ্ডামি নয়?
’এমডি’: এক ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তঃ
এই গভীর অপরাধবোধ এবং রাসূলের (সা.) নামের প্রতি অসীম শ্রদ্ধাবোধ থেকেই আমি আমার নামের শুরুতে পূর্ণ ‘মোহাম্মদ‘ এর পরিবর্তে ‘এমডি‘ (Md.) লিখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। এটি কেবল নামের সংক্ষেপণ বা স্টাইল নয়, বরং নিজের অযোগ্যতার এক নীরব স্বীকারোক্তি। আমার মনে হয়, পূর্ণ ‘মোহাম্মদ’ বা সংক্ষেপ ‘মোঃ’ লিখে যদি আমি সুন্নাহর অবমাননা করি, তবে তার দায়ভার হবে পাহাড়সম।
আমার কোনো ভুলের কারণে যেন সেই পবিত্র নামের মর্যাদা ক্ষুন্ন না হয়, নামের অংশ নিয়ে সামান্যতম বেয়াদবির কারণে যেন হাশরের ময়দানে আমাকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে না হয়— সেই ভয় থেকেই এই পথ বেছে নেওয়া। আমাদের সমাজে অনেকে একে স্রেফ ইংরেজি শিক্ষা বা আধুনিকতার প্রভাব মনে করলেও, আমার কাছে এটি এক প্রকার আত্মরক্ষা।
শেষ কথাঃ
লন্ডনের এই যান্ত্রিক ব্যস্ততার মাঝেও যখন নিজের নামের দিকে তাকাই, তখন বিবেককে প্রশ্ন করি— নামে নয়, কামে বা কর্মেই যেন আমরা প্রকৃত ‘মোহাম্মদ’ হতে পারি। আমাদের জীবন যদি রাসূলের (সা.) সুন্নাহর রঙে রাঙানো না হয়, তবে কেবল নামের শুরুতে তাঁর নামের অংশ রাখাটা যেন এক বিরাট বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
আমি চাই আমার সন্তান ”আব্দুর রহমান/ সালমান আরিফীন” নামের গুরুত্ব বুঝুক। সে জানুক, নাম রাখা মানে কেবল কয়েকটি অক্ষর বহন করা নয়, বরং সেই নামের অর্থের আমানত রক্ষা করা। আমাদের প্রার্থনা হওয়া উচিত, নামের এই মোহব্বত যেন কেবল আমাদের কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে আমাদের অন্তরে এবং কর্মে প্রতিফলিত হয়। এই অযোগ্যতা এবং নামের সাথে কাজের এই অমিল যেন দূর হয়। নামের এই চিহ্নটুকু নিয়ে আমাদের এই অনিচ্ছাকৃত প্রতারণা থেকে আমরা যেন মুক্তি পাই।
1 Comment
মুহাম্মদ/ মোহাম্মদ/ মোঃ/ এম ডি
এসবের মধ্যে প্রথমটিই অপেক্ষাকৃত সঠিক বানান। আরবিতে ওকারের উচ্চারণ নেই। তাই মোহাম্মদ/ মোঃ বানানের চেয়ে প্রথমোক্তটি অধিকতর শুদ্ধ।
এম ডি দ্বারা সাধারণত ম্যানেজিং ডিরেক্টর/ ডক্টর অব মেডিসিন বুঝানো হয়।
তাই আরবরা এটি অপছন্দ করে। ধন্যবাদ