muktokothon.com

নিরীহ মানুষের রক্ত মেখে কি সত্যিই বেহেশতে যাওয়া যায়?

নিরীহ মানুষের রক্ত মেখে কি বেহেশতে যাওয়া যায়? একজন মানুষকে হত্যা করে, একটি পরিবারকে ধ্বংস করে, একটি শিশুকে এতিম করে, একজন নারীর স্বামীকে কেড়ে নিয়ে—তারপর হাতে ধর্মের পতাকা তুলে কি কেউ নিজেকে আল্লাহর সৈনিক দাবি করতে পারে?

না। পারে না।

আর সেই প্রশ্নটি যতবার সামনে আসে, ততবারই আমাদের জিজ্ঞেস করতে হয়—ধর্মের নামে যারা মানুষের রক্ত ঝরায়, তারা আসলে কিসের ধর্ম প্রতিষ্ঠা করতে চায়?

ইসলামকে শান্তির ধর্ম হিসেবে বিশ্বাস করেন কোটি কোটি মুসলমান। সেই বিশ্বাসের সঙ্গে ধর্মের নামে বোমা, হত্যা, সন্ত্রাস, ভয় এবং রাজনৈতিক আধিপত্যের কোনো সহজ সমীকরণ নেই। ইসলামকে যারা মানুষের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও সহিংসতার অস্ত্র বানায়, তাদের রাজনৈতিক প্রকল্পকে প্রশ্ন করা তাই কোনো ধর্মবিদ্বেষ নয়। বরং ধর্মকে সন্ত্রাসীদের হাত থেকে মুক্ত রাখার দাবি।

কোরআন-হাদিসের নাম মুখে নিলেই কোনো সহিংসতা পবিত্র হয়ে যায় না। “জিহাদ” শব্দটি উচ্চারণ করলেই হত্যাকাণ্ড ন্যায্য হয়ে যায় না। শরিয়াহর কথা বললেই গণতন্ত্রের বিকল্প তৈরি হয়ে যায় না। আর মাথায় ধর্মীয় টুপি পরলেই রাষ্ট্রের ওপর কারও বিশেষ নৈতিক মালিকানা জন্মায় না।

বাংলাদেশ এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বহুবার গেছে।

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট জামাআতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি) দেশের প্রায় সর্বত্র সমন্বিত বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল—প্রায় ৫০০টি বোমা দেশের ৬৩ জেলায় বিস্ফোরিত হয়। এটি কোনো বিমূর্ত রাজনৈতিক বিতর্ক ছিল না। এটি ছিল রাষ্ট্র ও সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে সরাসরি সন্ত্রাসী আক্রমণ।

আর ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট—ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলায় অন্তত ২৪ জন নিহত এবং প্রায় ৩০০ জন আহত হন। 

এই ইতিহাস ভুলে যাওয়ার নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই ইতিহাসকে রাজনৈতিক সুবিধামতো ব্যবহার করাও উচিত নয়। ২০০১–২০০৬ সালের বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের একাধিক ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু সেই ইতিহাসের দায় নির্ধারণ করতে হলে প্রমাণ, তদন্ত ও আদালতের নথির ভিত্তিতেই কথা বলতে হবে। কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে ঘোষণা করে দেওয়া ইতিহাসচর্চা নয়।

তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও বিষয়টি স্পষ্ট রাখা জরুরি। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় ২০১৮ সালে নিম্ন আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে হাইকোর্ট সেই রায় বাতিল করে তাকে ও অন্য আসামিদের খালাস দেয়; ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে আপিল বিভাগও সেই খালাস বহাল রাখে।  অতএব আজ তাকে ওই মামলায় “সাজাপ্রাপ্ত আসামি” বলা আইনগতভাবে সঠিক নয়।

কিন্তু এখানেই প্রশ্ন শেষ হয়ে যায় না। বরং প্রশ্ন আরও কঠিন হয়।

যে দেশে ধর্মীয় রাজনীতির বিস্তার, খেলাফত প্রতিষ্ঠার স্লোগান, উগ্র মতাদর্শের প্রচার এবং সহিংস জঙ্গিবাদের ইতিহাস এত গভীর—সেখানে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা যে কোনো সরকারের কাছেই নাগরিকের প্রশ্ন থাকবে: আপনি কোন শক্তির সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক রাখছেন? ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা করছেন, নাকি ধর্মকে রাজনৈতিক ক্ষমতার সিঁড়ি হতে দিচ্ছেন? গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করছেন, নাকি এমন শক্তির জন্য জায়গা তৈরি করছেন যারা শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রকেই অস্বীকার করে?

এই প্রশ্ন বিএনপির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অন্য যে কোনো রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কারণ রাষ্ট্র কোনো দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।

আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে বিপজ্জনক ভুল হবে ধর্মবিশ্বাসী সাধারণ মানুষ আর ধর্মের নামে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করতে চাওয়া গোষ্ঠীকে এক কাতারে দাঁড় করানো। একজন মুসলমান তার ধর্ম পালন করবেন—এটি তার অধিকার। কিন্তু সেই অধিকার কাউকে অন্য নাগরিকের অধিকার কেড়ে নেওয়ার অধিকার দেয় না।

একজন হিন্দু পূজা করবেন। একজন বৌদ্ধ প্রার্থনা করবেন। একজন খ্রিস্টান গির্জায় যাবেন। একজন মুসলমান মসজিদে নামাজ পড়বেন। একজন নাস্তিক কোনো ধর্ম পালন করবেন না। একজন সংশয়বাদী প্রশ্ন করবেন। একজন নারী নিজের জীবন সম্পর্কে নিজের সিদ্ধান্ত নেবেন।

রাষ্ট্রের কাজ হবে তাদের সবাইকে রক্ষা করা। রাষ্ট্রের কাজ কারও ঈমানের পাহারাদার হওয়া নয়।

আর যে রাজনীতি নারীকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, ভিন্নমতকে হত্যা করতে চায়, লেখকের কলম থামাতে চায়, শিল্পীর কণ্ঠ বন্ধ করতে চায়, সংখ্যালঘুকে ভয় দেখাতে চায় কিংবা নাগরিকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর ধর্মীয় কর্তৃত্ব বসাতে চায়—তার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা কোনো অপরাধ নয়। বরং প্রশ্ন না তোলাটাই অপরাধ।

কারণ ধর্ম মানুষের বিবেককে আলোকিত করতে পারে; কিন্তু ধর্মের নাম করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের প্রকল্প মানুষকে শাসন করার যন্ত্রে পরিণত হতে পারে। এই পার্থক্যটি না বুঝলে আমরা আবারও ইতিহাসের একই অন্ধকার গলিতে ফিরে যাব। আমি এমন বাংলাদেশ চাই না, যেখানে মানুষের পরিচয়ের আগে তার ধর্মের পরিচয় পরীক্ষা করা হবে। আমি এমন বাংলাদেশ চাই না, যেখানে বেঁচে থাকার অধিকারও সংখ্যাগরিষ্ঠতার দয়ার ওপর নির্ভর করবে।

আমি এমন বাংলাদেশ চাই না, যেখানে কোনো রাজনৈতিক নেতা বা দল ধর্মের সার্টিফিকেট হাতে নিয়ে নাগরিকের স্বাধীনতার সীমা নির্ধারণ করবে। আর সবচেয়ে বড় কথা—আমি এমন কোনো ধর্ম চাই না, যার নামে নিরীহ মানুষের রক্ত ঝরিয়ে হত্যাকারী নিজেকে বেহেশতের দাবিদার ভাবতে পারে।

কারণ একজন নিরপরাধ মানুষের রক্ত কোনো রাজনৈতিক স্লোগানের চেয়ে বড়। একজন নিহত মানুষের জীবন কোনো ধর্মীয় ব্যাখ্যার চেয়ে বড়। একজন মায়ের কান্না কোনো ক্ষমতার রাজনীতির চেয়ে বড়। ধর্ম যদি সত্যিই শান্তির কথা বলে, তবে মানুষের জীবন তার প্রথম পরীক্ষা। আর সেই পরীক্ষায় নিরীহ মানুষের রক্তের কোনো বিকল্প নেই—শুধু একটি প্রশ্ন আছে:

নিরীহ মানুষের রক্ত মেখে কি সত্যিই বেহেশতে যাওয়া যায়?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *