বাংলাদেশের রাজনীতিতে রাষ্ট্রপতি পদে কার কেমন ভূমিকা ছিল—তা নিয়ে নতুন করে বিষোদগার করার কিছু নেই। ইতিহাস সাক্ষী, এই পদে ব্যাংক ডাকাত, দেশদ্রোহী, ক্ষমতার দালাল থেকে শুরু করে রাজাকারের কমান্ডার পর্যন্ত আসীন হতে পেরেছে। তবে মূল প্রহসনটা সেখানে নয়; প্রহসন হলো তাদের মুখে, যারা দিনরাত ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র জপমালা জপে। চেতনা বিক্রির রাজনীতি যাদের একমাত্র জীবিকা, তাদের সমর্থিত রাষ্ট্রপতির এমন বিতর্কিত ব্যাকগ্রাউন্ড অবশ্যই তাদের নীতিহীনতার এক জ্বলন্ত প্রমাণ। কিন্তু যাদের ন্যূনতম আত্মসম্মানবোধ বা লজ্জা নেই, তাদের কাছে নীতি প্রত্যাশা করাই বোকামি। দিনরাত টকশোতে মিথ্যাচার করে ধরা খাওয়ার পরও যারা নির্লজ্জের মতো হাসতে পারে, তাদের কাছে বিবেকের জবাবদিহিতা আশা করা অর্থহীন। আমাদের শীর্ষ নেতারা কি এসব সার্কাস দেখেন না, নাকি দেখেও অন্ধত্বের ভান করে থাকেন?
মূলত এই রাষ্ট্রপতির চরম নেতিবাচক দিকগুলো এবং তার ছদ্মবেশী রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে দেশের মানুষকে ও বর্তমান সরকারকে সতর্ক করতেই আমার এই লেখনি।
বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের আমলে আবদুল হামিদ, জিল্লুর রহমান কিংবা ‘চুপ্পু’দের মতো রাষ্ট্রপতিরা ছিলেন শেখ হাসিনার স্রেফ গৃহপালিত পুতুল। পিলখানা বিডিআর গণহত্যা, শাপলা চত্বরের তাণ্ডব, ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি, গুম-খুন এবং বিরোধী দলকে ধ্বংস করতে সাজানো মামলায় ফাঁসি দেওয়ার মতো প্রতিটি কালো অধ্যায়ে এই মেরুদণ্ডহীন রাষ্ট্রপতিরা মুখে কুলুপ এঁটে বসে ছিলেন। তারা ছিলেন অন্ধ, বধির ও বোবা। হাসিনা যা বলতেন, তারা কেবল সেটাই শুনতেন, দেখতেন এবং বাস্তবায়ন করতেন। তারা যে অথর্ব, তা দেশের মানুষ জানত; তাই তাদের থেকে জাতির কোনো প্রত্যাশাও ছিল না।
কিন্তু বর্তমান সরকারের সময় এই রাষ্ট্রপতির সমীকরণটি এক বিশাল গোলক ধাঁধা! সরকারি দল, বিরোধী দল কিংবা সাধারণ মানুষ—সবাই হয়তো মনে করছে এটি তাদের রাষ্ট্রপতি, অথচ পর্দার আড়ালে তিনি সেই পুরানো গোলামির রাজনৈতিক ধারাকেই বয়ে বেড়াচ্ছেন। যিনি আজ ক্ষমতায় বসে আছেন, তিনি তাকে সমর্থন দেওয়া দল, তার বিরোধিতা করা দল এবং তার কাছে নতুন কিছু প্রত্যাশা করা দেশের কোটি মানুষ—সবাইকেই ধোঁকা দেবেন। এই কারণেই বলি, আগের প্রকাশ্য শত্রুরাই ভালো ছিল! কারণ, প্রকাশ্য শত্রু থেকে নিজেকে সাবধানে রাখা যায়, কিন্তু ছদ্মবেশী ‘বন্ধু রূপী শত্রু’ থেকে আত্মরক্ষা করা কঠিন নয়, বরং প্রায় অসম্ভব।
বাংলাদেশের সর্বোচ্চ এই আসনটি আজ কেন দেশের জন্য সবচেয়ে বড় অভিশাপে পরিণত হয়েছে, তার কয়েকটি বাস্তব উদাহরণ দেওয়া যাক:
ফ্যাসিবাদের রক্ষাকবচ ও নিয়ন্ত্রিত বিরোধী দল: মহামান্য রাষ্ট্রপতি মূলত বিগত ফ্যাসিস্ট কাঠামোকে টিকিয়ে রাখার এক চূড়ান্ত গুটি হিসেবে কাজ করেছেন। যখন বিরোধী দলের শীর্ষ নেতারা জেলে, আত্মগোপনে কিংবা নির্বাসনে, তখন এক শ্রেণীর দালাল চক্র বিরোধী দল ও রাজনীতির সর্বোচ্চ আসনে বসে আন্দোলনের নামে ‘ঈদের পর কঠোর আন্দোলন’ এর মতো প্রহসন তৈরি করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে।
সার্বভৌমত্ব বিক্রি ও বিদেশি এজেন্ডা বাস্তবায়ন: স্বকীয়তা হারিয়ে যারা সরাসরি ভিনদেশী এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যস্ত, তাদের দ্বারা দেশের উন্নয়ন অসম্ভব। যে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ চালকেরা মুচলেকা দিয়ে ক্ষমতায় আসে কিংবা বিদেশি প্রভুদের আতিথেয়তা গ্রহণ করে নির্দেশনা নিয়ে আসে, সে রাষ্ট্র কখনো নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে না।
বিচারব্যবস্থার প্রহসন ও ক্ষমতার সুরক্ষা: কপালপোড়া জাতির ভাগ্যে কখনো নিরপেক্ষ অভিভাবক জোটে না। তাই তো মহামান্য পদটিকে ব্যবহার করা হয় রাজনৈতিক দোসরদের বাঁচানোর ঢাল হিসেবে। জঘন্য অপরাধী ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মাফ করে দেওয়া এবং একটি নির্দিষ্ট পরিবার বা গোষ্ঠীকে বিচারের হাত থেকে বাঁচাতে যেকোনো মূল্যে পদটির অপব্যবহার করা আজ নিয়মে পরিণত হয়েছে।
নামের পরিবর্তন, ব্যবস্থার নয়: বিদেশি প্রেসক্রিপশন আর জবরদস্তিমূলক রাজনীতির মাধ্যমে যদি নীতি নির্ধারণ নির্ধারিত হয়, তবে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ কেবল কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা দলের ওপর থাকা উচিত নয়। বাস্তবতা হলো—রাজনীতিতে কেবল ব্র্যান্ডের নাম বদলাচ্ছে, কিন্তু শোষণের ওষুধ একই রয়ে গেছে। শুধু কোম্পানির নাম পরিবর্তন করে জনগণের ওপর একই বিষ প্রয়োগ করা হচ্ছে।
শিল্পী শম্পা রেজার মত করে বলতে হয়— “আমি রাজনিতী করি না কিন্তু রাজনিতী খুব ভালো বুঝি, ছোট্ট বেলা থেকেই রাজনিতীর মধ্যে বড় হয়েছি। যেমনঃ অনেকে গান গায়না কিন্তু গান বুঝে……..”
যে পদটি একটি দেশের সম্মান ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক হওয়ার কথা ছিল, সেটিকে আজ বানিয়ে ফেলা হয়েছে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর সুরক্ষাকবচ। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সাধারণ মানুষের চোখে এই প্রকাশ্য প্রতারণা ধরা পড়লেও, রাজনীতির নামে যারা দেশের রক্ত চুষে খাচ্ছে, তাদের চোখে এগুলো ধরা পড়ে না। নাকি তারা জেনেবুঝেই এই অন্ধত্বের নাটক চালিয়ে যাচ্ছে? এই উত্তর আজ কোটি সচেতন বাঙালির কাছে ছেড়ে দিলাম।
বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, ইনকিলাব জিন্দাবাদ।
Type your paragraph here